মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার ১০৭ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি প্রকল্প

Loading...

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার ১০৭ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি প্রকল্প

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থায় অস্থিরতা বিরাজ করছে।

এতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যে শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করেছে, তা এখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলায় দক্ষিণ এশিয়ায় ১০৭ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের এলএনজি বিনিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এসব তথ্য জানিয়েছে গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের (জিইএম) ‘এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকার’। খবর অফশোর এনার্জি।

জিইএমের তথ্য অনুযায়ী, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বর্তমানে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে নতুন এলএনজি টার্মিনাল এবং গ্যাস পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা করছে বা নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকারের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রবার্ট রোজানস্কি জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বে যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি কেন্দ্র ও গ্যাস পাইপলাইন তৈরির কাজ চলছে, এর ১৭ শতাংশই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। এ অঞ্চলে ১১ কোটি টনের বেশি আমদানির সক্ষমতা এবং ৩৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ পাইপলাইন তৈরির কাজ এগোচ্ছে। জিইএমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বর্তমানে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, ভারত বিশ্বজুড়ে এলএনজি টার্মিনাল এবং পাইপলাইন সম্প্রসারণের অন্যতম বড় কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি নিয়ে বড় পরিকল্পনা থাকলেও অনেক প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। মূলত এলএনজির চড়া দামের কারণে আমদানিকারক দেশগুলো সংকটের মুখোমুখি হয় এবং প্রকল্প থেকে সারে আসে। এলএনজি বাজারে সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও জাহাজ চলাচলের পথ বা এর উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এতে গ্যাস সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। একই সময়ে এ অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

গ্যাস ট্র্যাকারের প্রজেক্ট ম্যানেজার বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।’

রবার্ট রোজানস্কির দাবি, জাহাজ চলাচলের পথে বা উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য গ্যাসের দাম যে দ্রুত বেড়ে যায় তা চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে। এতে গ্যাস সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলগুলো এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল হলে যে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, এ ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের পরিস্থিতি তুলে ধরে রোজানস্কি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে এলএনজি সরবরাহে উদ্বৃত্ত থাকার একটি পরিষ্কার সম্ভাবনা ছিল। চলতি দশকের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের নতুন করে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কথা ছিল। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্যাসের চাহিদা বাড়বে বলে এক ধরনের আশাবাদী পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান গ্যাস আমদানিকারক দেশ ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান খাতটিতে প্রায় ১০৭ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। তবে এ বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও চলমান যুদ্ধের বাইরেও এলএনজি খাতের প্রসারে এ দেশগুলো নানা বাধার মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও অতীতে নেয়া এলএনজি আমদানি প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশ সফল না হওয়া অন্যতম কারণ।’

রবার্ট রোজানস্কি এবং গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তেল ও গ্যাস কর্মসূচির পরিচালক জুলি জোলির মতে, এসব অবকাঠামো পরিকল্পনার সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর এ অঞ্চলের ভবিষ্যতের জ্বালানি খাত নির্ভর করবে। বর্তমানে ভারত বিশ্বজুড়ে এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন তৈরির দিক থেকে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বর্তমানে যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে, তা প্রায় দ্বিগুণ করার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করছে। এছাড়া গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের দিক থেকে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ ১৫টি দেশের তালিকায় এ দুই দেশের নাম রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর একটি ভুল ধারণা ভেঙে গেছে। আগে মনে করা হতো যে এশিয়ায় এলএনজি আমদানি সাশ্রয়ী হবে এবং এর সরবরাহও নিশ্চিত থাকবে। কিন্তু বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কাতারের এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে আমদানীকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

রোজানস্কি ও জোলি জানান, বর্তমানে চলমান জ্বালানি সংকটের বাইরেও যদি ভবিষ্যতে বাজারে গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে যায়, তবুও দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলোকে এলএনজির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

Loading...

Loading