মঙ্গলবার ১লা ডিসেম্বর ২০২০ |

ভিডিও না থাকলে প্রতিবাদ হবে না!

 বৃহঃস্পতিবার ২৭শে জুন ২০১৯ রাত ০৮:৫৭:৫৩
ভিডিও

এসএসসি পাশের সালের হিসাব করলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম আমার সমবয়সী। তিনি রাজশাহী থেকে ঢাকা এসেছেন,  একই সময়ে আমি এসেছিলাম কুমিল্লা থেকে। শুরুর দিনগুলোতে ঢাকায় তার জীবন সংগ্রামের সাথে মিলে যায় আমারটাও। তার ফেসবুকে পড়ে চমকে উঠেছিলাম, একই গল্প। শাহরিয়ার আলম পরে রাজনীতি করেছেন, ব্যবসা করেছেন। তিনি জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন; কিন্তু অন্য অনেকের মত জনবিচ্ছিন্ন হননি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাকে নানা দেশে যেতে হয়। কিন্তু তার যোগাযোগ এখনও মাটির সাথে, শেকড়ের সাথে। মানুষের আবেগটা ধরতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় এই প্রতিমন্ত্রী ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে অনেক ব্যবস্থা নেন। সমবয়সী বলেই কি-না জানি না, তার অনেক ভাবনার সাথে আমার মিলে যায়। যেমন বরগুনায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে এক তরুণকে হত্যার প্রতিবাদ করে তিনি বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তাতে হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন একটি প্রশ্নও। তার স্ট্যাটাসটি উদ্ধৃত করি, 'বরগুনার হত্যার গ্রেফতার এবং বিচার হবে, হতেই হবে।’

ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে বলে সবাই এটা নিয়ে কথা বলছেন। অবশ্যই ভালো। কিন্তু অন্য সবকিছু বাদ দিলাম। গতকাল মোটামুটি একই সময়ে রাজশাহীর তানোরে বাজারে আম বিক্রি করতে গিয়ে একইভাবে নিহত হয়েছে আর একজন তরুণ, প্রকাশ্যেই দিবালোকেই হত্যা করেছে পাশের আর এক দোকানদারের ছেলে। নিহতের একটা রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে, সে সেখানকার একটি ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। না কোনো টেন্ডার নিয়ে বা বান্ধবী নিয়ে ফ্যাসাদ নয়। সংসার চালাতে নিজেই বাগানের আম বিক্রি করতে গিয়েছিল সেই হতভাগা তরুণ।

সব মৃত্যুই আমাকে নাড়া দেয়। তরুণ-তরুণীর মৃত্যু একটু বেশি নাড়া দেয়। শিশুর মৃত্যু আরও বেশি নাড়া দেয়।

আমরা বরগুনার মত সবগুলোর ভিডিও দেখতে পাই না। গতকাল হয়তো এই দুইয়ের বাইরেও মানুষ খুন হয়েছে বা অপমৃত্যু হয়েছে। আমরা সবগুলোর খোঁজ রাখি না। তবে সচেতনতা সামাজিক সমস্যাগুলোকে কমিয়ে আনবে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যারা দেখছিলেন তারা মনে হয় না সাধারণ পথচারী বা ছাত্র। অবশ্যই তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমরা নিশ্চিত করবো প্রথমে গ্রেফতার তারপর ন্যায় বিচার। এব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।'

এই পয়েন্টটি আমাকে অনেকদিন ধরে ভাবাচ্ছে। প্রতিবাদ করতে হলে বা বিচার চাইতে হলে আমাদের প্রমাণ লাগে, ভিডিও হলে সবচেয়ে ভালো, নিদেনপক্ষে অডিও হলেও চলে।

বিএনপি আমলে অপারেশন ক্লিনহার্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যাত্রা শুরু। আর র‍্যাব প্রতিষ্ঠার পর শুরু হয় ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা। বিএনপির অনেক উদ্যোগ আওয়ামী লীগ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ক্রসফায়ারটা চালু রেখেছে। বিএনপি, তত্ত্বাববধায়ক, আওয়ামী লীগ মিলে ক্রসফায়ারের নামে কতো মানুষকে হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি বরাবরই ক্রসফায়ারের বিপক্ষে। আমি মনে করি, ক্রসফায়ার মানে ঠাণ্ডা মাথার খুন। কিন্তু সাধারণভাবে ক্রসফায়ার বেশ জনপ্রিয়, নিজের ঘাড়ে না আসা পর্যন্ত সবাই ক্রসফায়ারের পক্ষে। কিন্তু গত বছর টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের ক্রসফায়ারের পর একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়। একরামুলের মেয়ে তার বাবাকে বলছে, 'আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে।' আমাদের সবার হৃদয় ছুয়ে গেল। আমি যতবার এটা ভাবি, আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু একবার ভাবুন তো, একরামের যেমন পরিবার আছে, ক্রসফায়ারের নিহত অন্য সবারও কিন্তু আছে। আসলে ওইটুকু অডিও না থাকলে আমাদের হৃদয় তা স্পর্শ করতো না। এটা অবশ্য স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি।

ডিআইজি মিজান দুদকের পরিচালককে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন, টেলিসংলাপ ফাঁস না হলে এটা কেউ বিশ্বাস করতো না। তারাও অস্বীকার করে পার পেয়ে যেতেন। এখন দু’জনই সাময়িক বরখাস্ত।

আমি খালি ভাবি যদি সবার হাতে ক্যামেরা না থাকতো, যদি ফেসবুক না থাকতো তাহলে আমাদের প্রতিবাদের কী হতো, বিচারের কী হতো। ভিডিও থাকা না থাকার সাথে অপরাধের বিশাল পার্থক্য। ফেসবুক যুগের আগের কথা ভাবুন। চোর সন্দেহে একটি শিশু বা তরুণকে পিটিয়ে মারার খবর আগে হলে ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলাম ছাপা হতো। কিন্তু ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় সিলেটের রাজনের খুনিরা দ্রুত ধরা পড়ে। মূল আসামিকে সৌদি আরব থেকে ধরে আনা হয়। ভিডিও না থাকলে বা ফেসবুক না থাকলে রাজন হত্যার বিচারই হতো না হয়তো।

ফেসবুকপূর্ব যুগে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারার খবর হয়তো ভেতরের পাতায় ছাপা হতো। কিন্তু 'বখাটের কোপে কলেজছাত্রী আহত', এই নিউজের কী ট্রিটমেন্ট হতো? আমার মনে হয়, বেশিরভাগ পত্রিকা ছাপতোই না। আহত আবার কোনো নিউজ হলো নাকি। কিন্তু সিলেটে ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের এলোপাতাড়ি কোপে আহত খাদিজা দিনের পর দিন পত্রিকার প্রথম পাতাজুড়ে ছিলেন। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা হয়েছে। 'ছাত্রলীগ নেতার এলোপাতাড়ি কোপে কলেজছাত্রী আহত' এই নিউজের কোনো আবেদন নেই আমাদের কাছে। কিন্তু সাথে যদি ভিডিও থাকে, শিরোনাম যদি হয় 'এ কী করলেন ছাত্রলীগ নেতা (ভিডিওসহ)' তাহলে তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যাবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন গণমাধ্যমকে ডিকটেট করে। ফেসবুকে জনমত গড়ে ওঠে, ভিডিও ভাইরাল হয়; তারপর গণমাধ্যম তার পিছু ধাওয়া করে। আমার কাছে অবশ্য বিষয়টা খারাপ লাগে না। প্রতিবাদহীনতার এই সময়ে তবুওতো ফেসবুকে ভার্চুয়াল প্রতিবাদ হয়।

ফেসবুকই এখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল। তবে সব ঘটনা ফেসবুকের নজর পায় না। সব ঘটনায় ভিডিও বা অডিও থাকে না। অবস্থা এমন, বিচার পেতে হলে সারাদেশে সিসিটিভি লাগিয়ে রাখতে হবে, যাতে সব ঘটনার ভিডিও পাওয়া যায়।

আমরা বরগুনা রিফাত হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করার সাহস না পায়। পাশপাশি যেন একইদিনে তানোরে নিহত আম ব্যবসায়ী তরুণ হত্যারও বিচার হয়।

বাংলাদেশে যেন আইনের শাসন থাকে, সবাই যেন আইনের সুরক্ষা পায়। আমরা সাধারণ মানুষ, অডিও-ভিডিও ছাড়া আমরা বিশ্বাস করি না, প্রতিবাদ করি না। কিন্তু পুলিশ বা আদালত তো ভিডিও দেখে না, শোনে না; তারা সবার জন্য সমান। আইন সবার জন্য সমান হোক। আইনের শাসনে সবাই  নিশ্চিন্তে থাকুক।

তবে পাশাপাশি সিটিজেন জার্নালিজমটাও চলুক। সবাই যেন ভয়ে থাকে। কোথায় কে, কী ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়। আরেকটা কথা। শেষ কথা, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, আমরা যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি।  শুধু ভিডিও করা নয়, সবাই মিলে যেন অপরাধী নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি।

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

প্রভাষ আমিন

হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

সংশ্লিষ্ট খবর